সিলেট প্রতিনিধিঃ সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেছেন, আদিবাসীরা বাংলাদেশের নাগরিক হলেও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং সামাজিক বৈষম্যের নির্মম প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর।
রোববার (৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা কমিটি, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) যৌথভাবে কুলাউড়াস্থ জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং আবহাওয়া ও ঋতুর তারতম্যসহ নানা সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য। এসব সংকটের নির্মম শিকার হচ্ছেন আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও সনদে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাংলাদেশে তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এখনো নিশ্চিত হয়নি। সমাজে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে তাদের অভিহিত করে ক্রমাগত প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ভিসি জহিরুল হক বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশের ইতিহাস, কৃষি, সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসীদের জীবনযাত্রা বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কেবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক নন পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রত্যুষ আসাক্রা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন হীরামন হেলেনা তালাং ও মনিকা খংলা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৌলভীবাজার জেলা আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ফ্লোরা বাবলী তালাং। স্বাগত বক্তব্য দেন সিঙ্গুর পুঞ্জির ববিতা ডিও।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না, বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মইনুল ইসলাম শামীম, কুলাউড়া উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব করিম মিন্টু, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ডেরিক প্রেন্টিস ডাডলি, কুলাউড়া উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক নির্মাল্য মিত্র সুমন, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী এএসএম ছালেহ সোহেল, কারিতাস সিলেটের আঞ্চলিক পরিচালক বনিফাস খংলা, বাংলাদেশ অবলেটস জাস্টিস অ্যান্ড পিসের সমন্বয়কারী ফাদার ভ্যালেন্টাইন তালাং, কুলাউড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল বারী সোহেল ও আদিবাসী নেতা দোলন কুর্মিসহ অনেকে।
কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে না। সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে নিয়েই দেশের অগ্রযাত্রা। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সুরক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম ইতোমধ্যে বিভিন্ন পুঞ্জি পরিদর্শন করে সেখানকার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প দিচ্ছেন। তাদের সরকারের সময়ে কোনো পুঞ্জিতে অন্যায়ভাবে কাউকে হয়রানি বা জবরদখল করতে দেওয়া হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এর আগে সকাল ১১টায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি কুলাউড়া শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। কুলাউড়া মডেল থানার সামনে র্যালিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল। র্যালিতে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো: জীবন ও সুস্থতা রক্ষা করা’ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন ধাত্রী উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
আলোচনা সভা শেষে আদিবাসী শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
