মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের জটিলতা, জমি নিয়ে টানাপোড়েন এবং পরিবেশগত আপত্তি কাটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার প্রকল্প। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার অর্থায়নে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা (৬.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে নির্মিতব্য এই আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হবে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের ধলিরছড়া মৌজায়।
প্রকল্পটির জন্য ইতোমধ্যে মহাসড়কসংলগ্ন ১৫ দশমিক ২০ একর খাস জমি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর জমি বন্দোবস্তের ফাইল বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই নিবন্ধন শেষে শুরু হবে নির্মাণকাজ।
বাফুফের কর্মকর্তারা আশা করছেন, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হবে এবং জাতীয় দলের জন্য প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
যা থাকছে টেকনিক্যাল সেন্টারে
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, কোচিং শিক্ষা, খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং স্পোর্টস সায়েন্স কার্যক্রমকে এক ছাতার নিচে আনতেই এই কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
এখানে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাসের একাধিক ফুটবল মাঠ, আধুনিক জিমনেশিয়াম, চারতলা আবাসিক ভবন, শ্রেণিকক্ষ, ইনডোর ট্রেনিং কমপ্লেক্স, স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ভিডিও অ্যানালাইসিস ল্যাব, কোচিং এডুকেশন সেন্টার, ডাইনিং ও কনফারেন্স সুবিধা এবং বয়সভিত্তিক দলের জন্য পৃথক আবাসন।
এই কেন্দ্র থেকেই ভবিষ্যতে জাতীয় পুরুষ ও নারী দল, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩সহ সব বয়সভিত্তিক দলের দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প পরিচালিত হবে।
বদলে যাবে বাংলাদেশের ফুটবলের চিত্র
বাফুফের কর্মকর্তাদের মতে, টেকনিক্যাল সেন্টার চালু হলে বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যাবে। খেলোয়াড়রা বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন, কোচ ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান ফুটবলারদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো দেশের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ফলে জাতীয় ফুটবলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে কক্সবাজার।
পাঁচ বছরের জটিলতার অবসান
বাফুফের দাপ্তরিক সূত্র জানায়, ২০২২ সালে ফিফার নির্বাহী কমিটি বাংলাদেশের জন্য টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন দেয়। এরপর সারাদেশে সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন শেষে কক্সবাজারকে সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
প্রথমদিকে রামুর খুনিয়াপালং এলাকায় প্রায় ২০ একর জমি নির্ধারণ করা হলেও পরে সেটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ায় পরিবেশগত আপত্তি ওঠে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ আইনবিদদের সুপারিশের পর সেই স্থান বাতিল করা হয়।
এরপর দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৫ সালে রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজার ১৫ দশমিক ২০ একর খাস জমি নির্বাচন করা হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাফুফের নামে বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফাইল চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাফুফের প্রত্যাশা
বাফুফের প্রকল্প কর্মকর্তা তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী বলেন, কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান, পর্যাপ্ত জায়গা এবং মহাসড়কের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায় এই স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে এটি গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্পের স্থানীয় লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানান, ২০২২ সাল থেকে জমি নিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলেছে। পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে একাধিকবার পরিদর্শনের পর বর্তমান স্থানটি চূড়ান্ত করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক জমির উদ্দীন বলেন, নির্বাচিত জমিটি পাহাড় শ্রেণিভুক্ত নয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির আশঙ্কা নেই। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন জমি নির্ধারণ ও বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা। অনুমোদন মিললেই দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বিলম্বিত হয়েছে। এ সময়ে ফিফার কাছে একাধিকবার সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হয়েছে। কয়েক দফা প্রকল্প বাতিলের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে দেশের ফুটবলের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উপহার দিতে চায় বাফুফে।
