মোহাম্মদ সামিরঃ বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আজ এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক অপরাধী আইনকে আর ভয় পায় না। বিশেষ করে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হত্যা, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। কারণ একটাই অপরাধ সংঘটনের পরও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা দ্রুত বিচারের আওতায় আসে না কিংবা দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ দেশে প্রায়ই ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি কিংবা বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে নীরব হয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এবং সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে অপরাধ করলেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
যখন একজন ধর্ষক বা সন্ত্রাসী দেখে যে তার আগের অপরাধের কোনো কার্যকর শাস্তি হয়নি, তখন তার মধ্যে নতুন অপরাধ করার সাহস তৈরি হয়। বিচারহীনতা শুধু একটি মামলার সমাপ্তি না হওয়ার বিষয় নয় এটি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। আইন যদি অপরাধীর কাছে ভয়ংকর না হয়, তাহলে সমাজে অপরাধ দমন করা কখনোই সম্ভব নয়।
আজ দেশের বহু পরিবার তাদের সন্তান, বোন, স্ত্রী কিংবা মায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে চিন্তা করে, নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন অপরাধীরা প্রভাব, অর্থ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা কোনো রাষ্ট্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই যেন বিচার প্রক্রিয়ার মূল বিবেচ্য বিষয় হয়। তদন্তে গাফিলতি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণসহ সকল গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মানুষ অপরাধীর ক্ষমতা দেখতে চায় না, দেখতে চায় আইনের ক্ষমতা। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে অপরাধীর চেয়ে আইন বড় হয়। বিচারহীনতার অন্ধকার যত দীর্ঘ হবে, অপরাধ তত বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা তত বেশি হুমকির মুখে পড়বে। তাই সময় এসেছে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অপরাধীর জন্য নয়, ন্যায়বিচারের জন্য প্রভাবশালীর জন্য নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য।
