চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ দেশের ৬৪ জেলার বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্পখাতের সুযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করতে সমীক্ষা শুরু করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় পরিচালিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও হালনাগাদ বিনিয়োগকারী ডেটাবেস তৈরির পাশাপাশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।
মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে ‘বাংলাদেশ শিল্প জরিপ’ শীর্ষক বিভাগীয় কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়। বিডা, এডিবি ও দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্ক (সানেম) যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও চেম্বার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও চেম্বারে বিনিয়োগকারীদের তথ্য থাকলেও তা বিচ্ছিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো। একই বিনিয়োগকারীর একাধিক নিবন্ধনের কারণে তৈরি হওয়া ডুপ্লিকেট তথ্যও বিনিয়োগ পরিস্থিতি মূল্যায়নে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে। ডুপ্লিকেট তথ্য বাদ দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের পুরোনো ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ডেটাবেসটি বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিসের (ওএসএস) সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সমীক্ষাটি আগামী নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
রায়হান বলেন, শুধু বিনিয়োগকারীদের তালিকা তৈরি নয়, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটিও চিহ্নিত করা হবে। সমীক্ষায় বিদেশি, দেশীয় ও যৌথ উদ্যোগের বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সমীক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হলো ৬৪ জেলার আলাদা শিল্প ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা চিহ্নিত করা। রায়হান বলেন, চট্টগ্রামের বিনিয়োগ সম্ভাবনা রংপুর বা রাজশাহীর মতো নয়। তাই প্রতিটি জেলার সম্ভাবনাময় পণ্য, শিল্প ও অর্থনৈতিক খাত আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
বিডার নির্বাহী সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, হয়রানি এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবা পেতে একাধিক সরকারি দপ্তরে ঘোরার প্রয়োজনীয়তা শিল্পায়নের অন্যতম বড় বাধা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাত প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।
তিনি জানান, বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, কর্মসংস্থানে শুধু শিক্ষাগত ডিগ্রির চেয়ে বাস্তব দক্ষতা ও জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।
কর্মশালায় এডিবি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. চন্দন সাপকোটা, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবিদা সুলতানা, সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মো. জুবায়ের হোসেন, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়াসহ বিডা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
