সংকটের সময়ে দায়িত্ব: ড. ইউনূস ও একটি দেশের টিকে থাকার গল্প

নাটকীয় উন্নয়ন নয়, রাষ্ট্র ভেঙে পড়া ঠেকানোই ছিল দেড় বছরের মূল লক্ষ্য

by The Justice Bangla

মোহাম্মদ সামিরঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা কখনোই সহজ ছিল না। রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক জড়তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক চাপ সব মিলিয়ে এমন সময়গুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনা হয়ে ওঠে এক ধরনের সংকট ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা। জুলাই বিপ্লবের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল তেমনই এক ঝুঁকিপূর্ণ, অনিশ্চিত এবং রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত।

ড. ইউনূস কোনো প্রচলিত অর্থে রাজনীতিবিদ নন। ক্ষমতার রাজনীতির মাঠে তিনি অভ্যস্ত নন, দলীয় কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্কও সীমিত। বরং তিনি পরিচিত একজন সংকট ব্যবস্থাপক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সে কারণেই তার দেড় বছরের শাসনকালকে কোনো নাটকীয় উন্নয়নের গল্প হিসেবে দেখা যায় না। এই সময়কাল ছিল মূলত রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করার একটি নিরব, ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।

অর্থনীতি, প্রশাসন কিংবা পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি অলৌকিক কিছু করে দেখাননি এ কথা তার সমালোচকরাও স্বীকার করেন। দ্রব্যমূল্য হ্রাস, কর্মসংস্থানে বড় অগ্রগতি কিংবা কাঠামোগত সংস্কারের দৃশ্যমান সাফল্য এই সময়কালে খুব বেশি দেখা যায়নি। তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বড় কোনো গৃহসংঘাত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি। একটি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রের জন্য এটিও কম অর্জন নয়।

পররাষ্ট্রনীতিতে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। এই সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরোপুরি একঘরে হয়ে পড়েনি এটি তার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ড. ইউনূসের দায়িত্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে যাওয়া। রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সমালোচনা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, তিনি বিপ্লবকে কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে নয়, জনসম্মতির ভিত্তিতে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছেন। এটি একটি নীতিগত অবস্থান, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

তবে এটাও সত্য, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্বের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান কঠিন। দলীয় রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং নীতিহীন প্রতিযোগিতার ভেতরে এমন একজন ব্যক্তির জন্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। সে কারণেই নির্বাচনের পর তার বিদায় নেওয়া অনেকের কাছেই অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হচ্ছে।

ড. ইউনূসের দেড় বছরের দায়িত্ব পালন হয়তো ইতিহাসে বিতর্কিত থাকবে কেউ একে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখবে, কেউ দেখবে সংকটকালের ন্যূনতম সাফল্য হিসেবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই সময়কাল ভবিষ্যৎ শাসকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।

ইতিহাস হয়তো একদিন প্রশ্ন তুলবে এই কঠিন সময়ে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প আদৌ ছিল কি না।

You may also like

Leave a Comment