বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেটঃ দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবিতে), নিরাপত্তা জনিত কারণে ২০১৮ সালে ৩২০ একরের বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০২০ সালে সমাপ্ত হওয়া সীমানা প্রাচীর নির্মাণ উদ্দ্যোগে ভূমিকা রাখেন, তৎকালীন আওয়ামী শাসনামল, ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ২০২৪ শের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সাথে পদত্যাগ করে (উপাচার্য পদ) থেকে সরে দাঁড়ান বিভিন্ন সময়ে আলোচনা-সমালোচনার তুঙ্গে থাকা বিতর্কিত সাবেক এই উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১ এর অধীনে ৫ কোটি টাকার অধিক ব্যায়ে, ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে শুরু হওয়া সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজের একটা সময়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকা, বর্তমান সিলেট নগরের ৩৭-৩৮ নং ওয়ার্ডের টিলারগাঁও এবং নাজিরের গাঁও দুই এলাকার সংযোগ স্থল, ডরের পার নামক আব্দুর নূর মিয়ার বাড়ির সামনের সরকারি রেকর্ডীয় রাস্তা নির্ধারণ না করেই জনগণের চলাচলের রাস্তার ওপর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঐসময় স্থানীয় দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সরকারি রাস্তা ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করার দাবী জানালেও তা কর্নপাত করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এতে রাস্তার ওপর সীমানা প্রাচীর নির্মাণের ফলে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দুই ওয়ার্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা। ছিন্ন হয় সমপ্রীতির বন্ধন। পরে দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সরকারি রাস্তা উদ্ধার নির্ধারণ এবং জনগনের চলাচল উন্মুক্ত করনের জন্য গণস্বাক্ষর সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেন। কিন্তু যার আজও কোন সমাধান করা হয়নি।
স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে আলাপে জানা যায়, রাস্তার ওপর সীমানা প্রাচীর নির্মাণকালীন সময়ে ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের গাফিলতি ছিল। তৎকালীন সময়ে দুই ইউনিয়ন ও উপজেলার দায়িত্বে, খাদিম নগর ইউনিয়নে টিলারগাঁও এবং টুকের বাজার ইউনিয়নে ছিল নাজিরের গাঁও এলাকা। উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আশফাক আহমেদ, টুকের বাজার ইউপির চেয়ারম্যান শহিদ আহমদ এবং খাদিম নগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন দিলোয়ার হোসেন। এলাকাবাসী সরকারি রাস্তায় প্রাচীর নির্মাণ বন্ধে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও এগিয়ে আসেননি জনপ্রতিনিধি, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ।
পরে এই এলাকা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে আর ইউনিয়ন উপজেলা থেকে কোন ভুমিকা নেয়া হয়নি। ফলাফল ম্যাপ রেকর্ডে সরকারি রাস্তা উল্লেখ থাকলেও সরেজমিনে এখন তা উধাও।
এদিকে রাস্তা না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছে দুই এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর পাশাপাশি জরুরী নিত্য প্রয়োজনে যানবাহন সহ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করতে গেলে,আনুমানিক ৪০-৫০ ফুট দুরত্বের পথ অতিক্রম করতে ঘুরে আসতে হয় প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার সড়ক পথ। আবার জরুরী প্রয়োজনে থানা পুলিশকেও একই পথ অনুসরণ করতে হচ্ছে। প্রাচীর নির্মাণের দীর্ঘ ৮বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও সরকারি রাস্তা উন্মুক্ত না হওয়ায় প্রশাসনের শাসন নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন ক্ষোভ অসন্তোষ।
অন্যদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ২০২৫ সালের আগস্টে প্রত্যাশিত কাঙ্ক্ষিত সরকারি রাস্তা উদ্ধারে এলাকাবাসী আবারও সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক বরাবর গণস্বাক্ষর সহ আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনটিও আলোর মুখ দেখেনি।
খাদিম নগর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন এবং বর্তমান চেয়ারম্যান দিলোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রাস্তায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বন্ধে তার গাফিলতি ছিলনা দাবী করলেও আর কোন বক্তব্য প্রদান করা থেকে নিজেকে এড়িয়ে যান।
টুকের বাজার ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন সাবেক চেয়ারম্যান, বর্তমান সিলেট জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শহিদ আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তখন জনগণ বিমুখ ছিল। তিনি রাস্তায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বন্ধে উদ্যোগ নিলে বিভিন্ন ভাবে হুমকি-ধামকি পেতে থাকেন। প্রশাসনিক ভাবে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও কোন সাড়া পাননি। উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টি আমলে নেয়নি।
সিলেট সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আশফাক আহমেদ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আড়াল। বক্তব্যর জন্য যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না, যে স্থানটির কথা বলা হচ্ছে যতদূর জানেন নির্মিত প্রাচীর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আলী আকবর বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন না। সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী শাবিপ্রবিরও সিন্ডিকেড সদস্য। সরকারি রাস্তায় এরকম কিছু হয়ে থাকলে, বিস্তারিত জেনে দ্রুত সময়ের মধ্য ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।
