প্রীতম সরকার: ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ কিংবা ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা- দেশগুলোর মধ্যকার লড়াই যেন মাটি থেকে এখন আকাশ পথেই বেশি। যুদ্ধে আকাশ পথেই যেন সূচনা হয় প্রথম আক্রমণের। ভয়ানক যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া মিসাইল মুহূর্তেই যেন কাঁপন ধরিয়ে দেয় প্রতিপক্ষ দেশকে। মিসাইলের আঘাতে নিমিষেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় যেকোনো সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক স্থাপনা। তাই বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলো যুদ্ধে নিজেদের ভূখণ্ডকে নিরাপদ ও আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে ব্যবহার করে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
চারপাশে নতুন করে যখন যুদ্ধ-সংঘাত বাড়ছে তখন আবারো আলোচনায় আসছে কার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম থেকে রাশিয়ার ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ইসরাইলের ‘আয়রন ডোম’- দেশগুলোর আকাশকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে যেন দাঁড়িয়ে আছে অতিন্দ্র প্রহরী হিসেবে। শুধু অন্য দেশের মিসাইলকে প্রতিহত নয়, বরং সেগুলোকে ধ্বংস করে প্রতিপক্ষ দেশেও মিসাইল ছোড়ার সক্ষমতা রয়েছে দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়।
শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো যায় বলে মনে করেন সমর বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে বিশ্বের সকল পরাশক্তি ও উদীয়মান ক্ষমতাধর দেশের কাছে রয়েছে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আর এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বললেই সবার আগে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD- Terminal High Altitude Area Defense)। এটি মাঝামাঝি ও উচ্চ উচ্চতায় আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশকে সুরক্ষিত করতে রয়েছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Patriot Missile Defense System)। এটি বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রাশিয়াও যেন এক ঘুমন্ত ড্রাগন। এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন রাশিয়ার আকাশকে রেখেছে সুরক্ষিত, ঠিক তেমনি গোটা বিশ্বে জানান দিয়েছে কেন তারা পরাশক্তি।
আকাশপথে রাশিয়ার উপর হামলা চালানো- বলা চলে এটি এক প্রকার বোকামি! দেশটির সংগ্রহে রয়েছে এস-৩০০ (S-300), এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ (S-400 Triumph), এস-৫০০ প্রোমেথিউস (S-500 Prometheus), এ-১৩৫ (A-135) এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এস-৩০০ (S-300)- এটি মূলত দীর্ঘ পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ১৯৭০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক তৈরি যুদ্ধবিমান, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে সক্ষম এটি। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মিসাইলের সক্ষমতা ৭৫ থেকে ২০০ কিলোমিটার। এর বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যে রয়েছে- এস-৩০০ পি ও এস-৩০০ ভি। এছাড়াও রয়েছে এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এটি মূলত এস-৩০০ পরিবারের একটি উন্নত সংস্করণ, যা ২০০৭ সালে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়। এস-৩০০ থেকেও বেশি শক্তিশালী এই এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমটি। প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমান, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে এস-৩০০ থেকেও এটি বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর যা যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ পরিক্ষিত ও প্রমাণিত।

এস-৩০০ (S-300)
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতোই ইসরাইলেরও রয়েছে বেশ শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং-এর মতো অত্যাধুনিক শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
আয়রন ডোম (Iron Dome)- এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা স্বল্প পাল্লার রকেট, আর্টিলারি ও মর্টার শেল প্রতিরোধে সক্ষম। এটি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে সুরক্ষা দেয়। আকাশপথে প্রতিপক্ষের যেকোনো হামলা প্রতিহত ও নিজেদের আকাশ সুরক্ষায় ইসরাইলের সামরিক বাহিনী এটি ব্যবহার করে।

আয়রন ডোম (Iron Dome)
ডেভিডস স্লিং (David’s Sling)- এটি মাঝারি ও দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে। এটি আয়রন ডোম ও অ্যারো সিস্টেমের মাঝামাঝি স্তরের প্রতিরক্ষা দেয়।

ডেভিডস স্লিং (David’s Sling)
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা রাশিয়ার মতো পিছিয়ে নেই আরেক পরাশক্তি চীনও। চীনের হাতে রয়েছে HQ-9 আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি মূলত রাশিয়ার এস-৩০০ এর অনুকরণে নির্মিত। এটি বিমান, ক্রুজ মিসাইল এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলসহ বিভিন্ন ধরণের আকাশ হুমকিকে প্রতিহত করতে সক্ষম। মূলত এস-৩০০ এর অনুকরণে নির্মিত হলেও এটি এস-৩০০ থেকে বেশি শক্তিশালী বলে ধারণা করা হয়। ১৯৯০ সাল থেকে এটি চীনের সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়।
ভারতেরও রয়েছে নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারতের সামরিক বাহিনীর কাছেও রয়েছে তাদের নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আকাশ’। এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত মোবাইল সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল। এর নতুন সংস্করণ ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত ফাইটার জেট, ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম।
এছাড়াও ভারতের আকাশ ব্যবস্থার মূল শক্তি মূলত রাশিয়া থেকে নেওয়া এস-৪০০, যা চীন ও পাকিস্তান সীমান্তে আকাশ সুরক্ষায় অ্যাকটিভ রয়েছে।
এদিকে ভারতের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তানও নিজের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যবহার করে কঠোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যার মধ্যে রয়েছে চীনের তৈরি HQ-16 ও HQ-9।
এতো পরাশক্তিধর দেশের ভিরে উন্নতীর ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়ও, যদিও এটি এখনো সীমিত পর্যায়ে উন্নত। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তি উন্নত করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে- রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থা, সারফেস টু এয়ার মিসাইল (SAM), অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান (AAA) ইত্যাদি।
এছাড়াও রয়েছে বেশকিছু যুদ্ধবিমান- রাশিয়ান ফাইটার- MiG-29, চায়নিজ মিগ-২১ ও K-8W। মূলত এটি একটি মৌলিক ডিফেন্স শিল্ড তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরো আধুনিক হওয়ার পথে রয়েছে।
জাস্টিস বাংলা/এইচএস
