কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর হাতে আটক ৩ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ছেড়ে দেয় থানা থেকে!

by The Justice Bangla

মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টায় থানা পুলিশ কর্তৃক ‘মুক্তি’; ওসির দাবি ওয়ারেন্ট নেই, নথিপত্র দেখালে সুর বদল

এরফান হোছাইন, কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ
কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ১২টি মামলার ৩টি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এবং জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

গত মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানে সাজ্জাদুল করিম (৩৮) নামে ওই আওয়ামী লীগ ক্যাডার আটক হলেও কয়েক ঘণ্টার মাথায় রহস্যজনকভাবে পুলিশের হেফাজতে থাকা আসামী থানা থেকে তিনি ‘মুক্তি’ পান। এই ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সততা নিয়ে জেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

থানা ও সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার আনুমানিক আড়াইটার দিকে শহরের লালদীঘি পাড়স্থ হোটেল জিয়া কমপ্লেক্সের সামনে প্রধান সড়কে এক বিশেষ অভিযান চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল। অভিযানে ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের পশ্চিম গোমাতলী এলাকার মৃত আব্দু শুক্কুরের ছেলে সাজ্জাদুল করিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুতার সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের ‘ওয়ারেন্ট নেই’ অজুহাত ও নথিপত্র
গ্রেপ্তারের পর সেনাবাহিনী সাজ্জাদকে শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে সদর থানার এএসআই জয়দেব দে-র কাছে হস্তান্তর করে। তবে থানায় নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমিউদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, “সেনাবাহিনী সাজ্জাদুল করিমকে আমাদের হেফাজতে দিয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
অথচ অনুসন্ধানে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩টি কার্যকর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুটি বন মামলা (বন-১১১/২১ এবং বন-১৬৮/২১) এবং ঢাকা দায়রা জজ আদালতে চলমান একটি মাদক মামলার (উত্তরা পশ্চিম থানা মামলা নং-১৫) ওয়ারেন্ট রয়েছে। যখন এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ওয়ারেন্টের নথিপত্র ও স্মারক নম্বর ওসির সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখন তিনি সুর বদলে বলেন, “এই নথিপত্রগুলো থাকলে তাকে আবারও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হবে।”

সাজ্জাদ কেবল একজন সাধারণ অপরাধীই নন, বরং গত জুলাই বিপ্লবের সময় ১৬ জুলাই কক্সবাজার সরকারি কলেজের সামনে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার (জিআর-৬৬৫/২৪) ৬৪ নম্বর এজাহারভুক্ত দুর্ধর্ষ আসামি; যার বিরুদ্ধে মাদক, চাঁদাবাজি, বনভূমি দখল এবং অস্ত্র নিয়ে চিংড়ি ঘের দখলসহ অন্তত ১২টি মামলার রেকর্ড রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অভিযুক্তের কাছে একটি বিদেশি ৯ এমএম পিস্তল রয়েছে, যা ব্যবহার করে ২০২১ সালে গোমাতলীর ‘এ-ব্লক’ চিংড়ি ঘেরে আব্দুল হক ওরফে গুরা মিয়া ও নুরুল আবছারের কাছে সরাসরি চাঁদা দাবি এবং গত বর্ষা মৌসুমে ‘ডি-ব্লক’ চিংড়ি ঘেরটি অবৈধভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি ঈদগাঁওর ইসলামাবাদ ইউনিয়নে বন বিভাগের প্রায় ৭ কানি জায়গা দখলের মতো দুর্ধর্ষ সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তিনি সরাসরি জড়িত বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

 

সাজ্জাদ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান ও যুবলীগ সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সদর থানার ওসি ও এএসআই জয়দেবের যোগসাজশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, সেনাবাহিনী যখন তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে, তখন স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে। কিন্তু পুলিশ তথ্য যাচাই না করেই তাকে ছেড়ে দেওয়ায় আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের হয়ে এলাকায় এখনো ‘না’ ভোটের প্রচারণা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা সাজ্জাদের মুক্তিতে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও বিষ্ময় প্রকাশ করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, পুলিশের এমন পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে মাঠ পর্যায়ে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ও যৌথ বাহিনীর সফল অভিযান ম্লান হয়ে পড়ছে।

একাধিক আইনজ্ঞ ব্যক্তি জানান, ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও এবং জুলাই বিপ্লবে সরাসরি হামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও পুলিশি ‘হেফাজত’ থেকে এমন দুর্ধর্ষ আসামির মুক্তি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞা। পুলিশের অভ্যন্তরে থাকা ‘আওয়ামী দোসরদের’ কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

You may also like

Leave a Comment