সিলেটে হাজার কোটি টাকার বালু বানিজ্যে রাজস্ব বঞ্চিত সরকার

by The Justice Bangla

বিশেষ প্রতিনিধি | মোঃ জামাল উদ্দিন, সিলেটঃ সিলেটের উত্তর পুর্বাংশের তিন উপজেলা (জৈন্তা-গোয়াইনঘাট ও সিলেট সদর উপজেলার) বুক চিরে বয়ে চলা সারি-গোয়াইন নদীর সিলেট সদরের বাদাঘাট। সদরে নদীর এই অংশ আবার চেঙ্গেরখাল নামে পরিচিত। বিট ও নির্মাণ বালু ক্রয়-বিক্রয়ে বাদাঘাটের রয়েছে সুপরিচিতি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া এই নদীর বাংলাদেশ অংশে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসে পলি, পাথর ও উন্নতমানের প্রচুর বালু। নির্মাণ শিল্পের অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ এই বালু বর্ষায় ব্যবসায়ীরা গোয়াইনঘাট, জাফলং, জৈন্তাপুর ও সারিঘাট এলাকা থেকে সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মজুদ করেন। এর মধ্য ব্যাক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাদাঘাট বানিজ্যিক এলাকায় বিশাল একটা অংশ মজুদ করা হয়।

চেঙ্গেরখাল নদীর বাদাঘাট এলাকার দুই তীরবর্তী সিলেট সদরের কান্দিগাঁও ইউনিয়নের মোগলগাঁও ও পুটিকাটা এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে প্রায় দেড় শতাদিক বালু ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। বছরে হয় প্রায় হাজার কোটি টাকার ওপরে বানিজ্য। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা করতেন যার নিয়ন্ত্রণ। শুষ্ক মৌসুম সহ সারা বছর এখান থেকে নির্মাণ কাজের জন্য বালু সংগ্রহ করেন নগরবাসী। পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় হয় নদী থেকে উত্তোলিত বিট বালু।

সুপরিচিত বানিজ্যিক এই স্থানের নামের পাশে সুনামের সাথে রয়েছে কুখ্যাতি। জাফলং, সারি ও গোয়াইনঘাট এলাকা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালুও এখানে ক্রয়-বিক্রয় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর নেই ব্যবসা পরিচালনার অনুমতিপত্র ট্রেড লাইসেন্স। থাকলেও করা হয়না নিয়মিত নবায়ন। ফলে সরকার বছরে শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

খোদ সদরের কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কৃপেশ রঞ্জন চৌধুরী নিজেই জানেন না এখানে রয়েছে কতটি বালু ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। বালু ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্সে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে কত টাকা কর। কতটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ট্রেড লাইসেন্স। বছরে কতটি হয় নবায়ন। অবশ্য তিনি কোন তথ্য দিতে না পারলেও তার সহকারী আমির হোসেনের কাছ থেকে জেনে নেয়ার ইঙ্গিত দেন। আমির হোসেনের দেয়া তথ্যমতে কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ বালু ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রতি বছরে ২২৫ দুইশ পচিশ টাকা ভ্যাট সহ ১৭২৫/= সতেরোশ পচিশ টাকা আদায় করে থাকে। কিন্তু আমির হোসেন সর্বমোট কতটি প্রতিষ্ঠান কে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ,বছরে নবায়ন হয় কতটি বা কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় সর্বমোট কয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার তথ্য দিতে পারেন নি।

সরেজমিন ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে জানা যায়, বাদাঘাট, নদীর উত্তর তীর সহ আশপাশের আরও তিনটি এলাকা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় দেড় শতাদিক বালু ক্রয়-বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। কোন প্রতিষ্ঠানের নেই ট্রেড লাইসেন্স, কেউ কেউ ট্রেড লাইসেন্স আছে দাবী করলেও তা দেখাতে পারেননি। একেকজন ব্যবসায়ী বছরে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৭ লক্ষ ঘনফুট বালু ক্রয়-বিক্রয় করেন। যার হিসেব করলে দাঁড়ায় প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এত বিশাল পরিমান বানিজ্য হলেও রাজস্ব বঞ্চিত সরকার। ইউনিয়ন পরিষদও রয়েছে উদাসীন ভূমিকায়।

অন্যদিকে চেঙ্গেরখাল নদীর বাদাঘাট এলাকার সিলেট সদরের বড়চর ও ছোটচর নামক দুটি স্থান থেকে বৈধ উপায়ে বালু উত্তোলনে ইজারা প্রদান করে জেলা প্রশাসক। কিন্তু প্রায় সারা বছর নদীর কোথাও না কোথাও থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ আপত্তিও ঠেকাতে পারে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। সেই বালু আবার বাদাঘাট এলাকার এনে বিক্রি করা হয়।

বালু ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ, দেড় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে মানতে না চাইলেও ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া অনেকে ব্যবসা করেন বলে জানান, বৈধ উপায়ে ব্যবসায়ীরা বালু ক্রয়-বিক্রয় করেন দাবী করলেও সেটি বছরে হাজার কোটি টাকার কম হবে বলেও জানান। সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলেও কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মনাফ এর কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া না গেলে বক্তব্য সংগ্রহ করা যায়নি।

সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াৎ বলেন, যেহেতু ইজারাকৃত স্থান থেকে সংগ্রহ করা বালু উত্তোলন ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা আছে, সেক্ষেত্রে বাদাঘাট এলাকায় বালু ক্রয়-বিক্রয় করা নিয়ে রাজস্ব আদায়ে আইনের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়াও চেঙ্গেরখাল নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে বলেও জানান।

You may also like

Leave a Comment