২৬ বছর ধরে অনুমোদনহীন আ.লীগের মেয়র বিল্ডিং

সাবেক মেয়র রেজাউল করিমের পরিবারের দখলে বহুতল ভবন, নিয়মিত ভাড়া আদায় নীরব সিডিএ

by The Justice Bangla

নিজস্ব প্রতিবেদন | জাস্টিস বাংলাঃ চট্টগ্রাম নগরের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার–চট্টেশ্বরী রোডের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে ছয়তলা একটি ভবন ডা. হারুনুর রশীদ চৌধুরী ভিলা স্থানীয়ভাবে পরিচিত মেয়র বিল্ডিং নামে। ভবনটিতে রয়েছে ১২টি আবাসিক ইউনিট ও একটি দোকান। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই বহুতল ভবনটি গত ২৬ বছর ধরে কোনো মালিকানা কাগজ, কোনো ভবন নকশা কিংবা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদন ছাড়াই ব্যবহার হয়ে আসছে। তবুও নিয়মিত ভাড়া উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম চৌধুরীর পরিবারের হাতে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর পরিবারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ভাড়াটিয়াদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে ভাড়া তুলতেন সাবেক মেয়রের লোকজন। বর্তমানে ভাড়া সংগ্রহ করছেন তাঁর ছোট ভাই নজরুল করিম চৌধুরী ও সুমন নামের একজন ব্যক্তি। মালিকানা অস্পষ্ট, সিডিএর কোনো অনুমোদন নেই, নগর পরিকল্পনায় ভবনটির অস্তিত্ব নেই তবুও কীভাবে বছরের পর বছর একটি বহুতল ভবন দখলে রেখে ভাড়া ব্যবসা চলল, তা নিয়েই এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

ভবনের দারোয়ান আলমগীর প্রথমে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও সাংবাদিক পরিচয় জানার পর স্পষ্টতই সতর্ক হয়ে পড়েন। তবে তিনি স্বীকার করেন, আগে রেজাউল সাহেবের লোকজন ভাড়া তুলতো। সরকার বদলের পর উনি পলাইয়া গেছে। এখন ভাড়া নেন নজরুল ভাই আর সুমন।
ভবনের একাধিক ভাড়াটিয়াও অনানুষ্ঠানিকভাবে একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ভবনটি পরিদর্শন করে। সিডিএর অথোরাইজড অফিসার প্রকৌশলী তানজির বলেন, মৌখিক অভিযোগের পর লোক পাঠানো হয়েছিল। কেউ কোনো অনুমোদনের কাগজ দেখাতে পারেননি। ভবনটি অনেক পুরনো আগে কখনো অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নই। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিডিএর মাঠ কর্মকর্তা বিধান বড়ুয়া আরও স্পষ্ট করে বলেন, হারুনুর রশীদ ভবনে গিয়ে কোনো কাগজ পাইনি। মালিকপক্ষ দাবি করেছে কাগজপত্র নাকি পুড়ে গেছে। কিন্তু সিডিএ প্ল্যান বা মালিকানার কোনো নথির কপি দিতে পারেনি।

সাবেক মেয়রের ভাই নজরুল করিম চৌধুরী দাবি করেন, ১৯৫৬ সালে তাঁদের বাবা জমিটি কিনেছিলেন এবং সন্তানদের নামে আমমোক্তারনামা করেছিলেন। তবে পরবর্তী প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০০৭–২০০৮ সালে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। আবার বলেন, বর্তমানে কয়েকজন মিলে ভবনটি কিনে ভাড়া তোলা হচ্ছে।
কিন্তু কারা সেই ‘কয়েকজন’, কোন আবাসন প্রতিষ্ঠান, কবে ও কীভাবে মালিকানা বদল হয়েছে এসব প্রশ্নে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। ফলে ভবনটির মালিকানা ইতিহাস আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টানা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক মেয়র রেজাউল করিম ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে শক্ত অবস্থানে। সেই রাজনৈতিক প্রভাবেই অনুমোদনহীন এই ভবন দখলে রাখা এবং নির্বিঘ্নে ভাড়া আদায় সম্ভব হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক মেয়র পলাতক হন। ওই সময় তাঁর বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এরপরই মেয়র বিল্ডিং নতুন করে আলোচনায় আসে।

সিডিএর এক বোর্ড সদস্য বলেন, মালিক যেই হোন, অনুমোদন ছাড়া বহুতল ভবন চলতে পারে না। পরিচিত বা প্রভাবশালী কারো ভবন হলে অনেক সময় বিষয়গুলো নীরবে চাপা পড়ে এটাও বাস্তবতা। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আগামী বোর্ড মিটিংয়ে তুলব। নিয়মতান্ত্রিক তদন্ত হওয়া উচিত।

চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন নগরের কেন্দ্রস্থলে একটি ছয়তলা ভবন ২৬ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেও সিডিএ কি সত্যিই কিছু জানত না? নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের টহল, নকশা যাচাই ও অনুমোদন ব্যবস্থাপনা কি তবে শুধুই কাগুজে?

আরও প্রশ্ন উঠেছে দুই যুগ ধরে নিয়মিত ভাড়া আদায় হলেও একবারও কেন তদন্ত হয়নি? অনুমোদনহীন বহুতল ভবন নির্মাণ যে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, তা জেনেও প্রশাসনের এই দীর্ঘ নীরবতাকে অনেকেই ‘মৌন সমর্থন’ হিসেবে দেখছেন।

ভবনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন ভাড়াটিয়ারা। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় উচ্ছেদ বা সিলগালা হতে পারে। আবার মালিকানা জটিলতায় পড়লে তাঁদের বিকল্প আবাসনের কোনো নিশ্চয়তাও নেই।

মালিকানা, অনুমোদনহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব সব মিলিয়ে ‘মেয়র বিল্ডিং’ চট্টগ্রামের নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার এক ভয়াবহ, গোপন বাস্তবতার চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। সিডিএ এখন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি প্রভাবশালীদের জন্য নিয়ম আবারও নীরবে ভেঙে পড়বে।

You may also like

Leave a Comment