নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আবারও সমালোচনায় ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ তদন্ত তালিকার সেই রেল কর্মকর্তা
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে একটি অভিযোগ তদন্তকে কেন্দ্র করে গুরুতর আইনগত ও প্রক্রিয়াগত অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকার ঘোষিত ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ শনাক্তে তদন্ত তালিকায় নাম ওঠা সেই সমালোচিত রেল কর্মকর্তা চিফ পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালার বিরুদ্ধেই আবারও উঠছে নতুন অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি নিয়ম-নীতির উপেক্ষা করে বিতর্কিত এক অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে কো-অপ্ট করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু তদন্তের নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং পুরো প্রক্রিয়াকে আরও বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে পূর্বাঞ্চলের চিফ পার্সোনেল অফিসার তরুণ কান্তি বালার প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছে খোদ তদন্ত কমিটিই।
তরুণ কান্তি বালার নির্দেশে গঠিত ওই তদন্ত কমিটি তদন্ত শুরুর আগেই পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করেন।
পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি দেখতে পান, তদন্তের জন্য কোনো স্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে কমিটির এখতিয়ার, তদন্ত কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা শুরু থেকেই অনির্ধারিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
এরপরও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তদন্ত কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে সহ-সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়। অথচ কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে একজন বর্তমানে কর্মরত আইন কর্মকর্তাকে কো-অপ্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে একজন অবসরপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্ত কমিটির লিখিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত এই আইন কর্মকর্তা এর আগেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট সময়কালে অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ, তিনি একই মামলায় একাধিক ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি। এমন অবস্থায় তাকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) সৃষ্টি করে এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ভঙ্গ করে।
কমিটির মতে, এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত সম্ভব নয়। বরং পুরো তদন্তকে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার স্পষ্ট আলামত রয়েছে। এমন তদন্ত থেকে উদ্ভূত যেকোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং প্রতিষ্ঠানকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে বলেও সতর্ক করেছে কমিটি।
এই পরিস্থিতিতে অভিযোগ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) আতাউল হক ভূঁঞা এবং অভিযোগ তদন্ত কমিটি সদস্য বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (সদর) নূর-এ-জান্নাত রুমি একমত হয়ে তদন্ত কমিটি থেকে অব্যাহতি চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন।
এদিকে অভিযুক্ত আদালত পরিদর্শক গ্রেড-১ জিনিয়া নাসরীন তার লিখিত আপত্তিতে অভিযোগ করেন, এই তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিন সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে ষষ্ঠ গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র আইন কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করা হলেও নথিপত্র অনুযায়ী তিনি কখনোই ওই গ্রেড বা পদে ছিলেন না।
জিনিয়া নাসরীন আরও অভিযোগ করেন, অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিন তার চাকরিকালীন সময়েও তাকে নানাভাবে হয়রানি করেন।
তবে তদন্ত কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে কো-অপ্ট করার বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালা জানান, তিনি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেননি-বরং রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে জানিয়ে ও তার মতামত নিয়েই এই তদন্ত কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে রাখা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
