মো: তারিকুল ইসলাম,পটুয়াখালীঃ চট্টগ্রাম — বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী লেখক ও ভাষানুবাদক প্রমথ চৌধুরীর একটি উক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
“বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে, নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে।” 
এই কথাটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বিশেষ স্বাতন্ত্র্য ও বাংলা মান-ভাষার ধারার তুলনায় তার প্রভাবশালিতায় ভিন্নতা চিত্রায়নের একটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
চাটগাঁইয়া ভাষাকে কীভাবে বুঝবেন?
এটি ইন্দো‑আর্য ভাষার দলের বাংলা‑অসমীয়া শাখার অন্তর্গত, তবে মান বাংলা ও অন্যান্য পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার তুলনায় এতে ভাষাতত্ত্বীয় এবং উচ্চারণগত পার্থক্য বেশি। 
ভাষাবিদদের মতে, চাটগাঁইয়া ভাষার প্রায় ৭০% শব্দ ও কাঠামো মান বাংলার সাথে মিল নেই — তাই বাংলা ভাষাভাষীর অর্ধেক অধ্যবসায় সত্ত্বেও পূর্ণ বোধগম্য হতে কঠিন। 
আন্তর্জাতিকভাবে এই ভাষাটি অনেক সংস্থার (যেমন গ্লোটোলগ, লিঙ্গুয়াস্ফেয়ার) স্বীকৃত স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবেও বিবেচিত। 
আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ২ কোটি ভাষাভাষীর সংখ্যা চাটগাঁইয়াকে পৃথিবীর ৭৫‑৮৮তম বৃহত্তম ভাষা করে তুলেছে। 
প্রচলিত শব্দ ও প্রবাদ: ভাষার অনুবাদাতীত রূপ
চাটগাঁইয়া ভাষার কিছু স্বতন্ত্র শব্দ ও প্রবাদ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য:
সাধারণ শব্দ:
মুরগী → কুরো, মোরগ → লাতা কুরো
সমুদ্র → দইজ্জে, পেয়ারা গুয়াছি
ফিঙে পাখি → দেচ্ছো, টয়লেট → টাট্টি  
অনন্য এক্সপ্রেশন:
অবাইজ্জেহুদা! আত্তামারেবাপ মাইল্লেফিরে! যেগুলো বাংলা বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব।  
জনপ্রিয় প্রবাদ:
ফুঁদত নাই ত্যানা, মিডা দি ভাত হানা” (পিছায় জামা নেই তবুও ‘মিঠাই’ দিয়ে ভাত খেতে চায়)
ঘরর গরুএ ঘাডার খের নহায়” ইত্যাদি—মূল রূপক ভাব সম্পৃক্ত যা মান বাংলা অনুবাদেও রস হারায়। 
স্থানীয় ভাষাবিদ ও লেখকদের বক্তব্য
ড. মনিরুজ্জামান, একজন স্বনামধন্য ভাষাবিদ মন্তব্য করেন
চাটগাঁইয়া ভাষার মধ্যে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষা থেকে প্রচুর ভাষাতত্ত্বীয় পার্থক্য বিদ্যমান — তাই একে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবেই শ্রেণীভুক্ত করা যুক্তিসংগত। চাটগাঁইয়ার ভাষা নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ও স্বরনির্ভর বৈশিষ্ট্যের কারণে ভাষা হিসেবে গঠনযোগ্য। 
অবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, প্রাচীন ভাষাতত্ত্বজ্ঞানী লেখক লিখেছেন
চাটগাঁইয়া ভাষায় লিখিত বাংলা ভাষার সঙ্গে বৈষম্য এতটাই বেশি যে এক সময়ে আমরা অসমীয়ার মতো এ ভাষাকে পৃথক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে পারতাম। 
সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া, তাঁর ‘নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও বাংলা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন
চাকমাদের ভাষা আটক‑বর্মীর আগেই চাটগাঁইয়া ভাষা সে পথে হেঁটেছে — সামাজিক ও ভাষাতাত্ত্বিক অগ্রগতিতে স্বাধীনতা পায়। অকৃপণ ভালোবাসা ও পূর্ণতা পেলে এর স্বীকৃতি আরো দৃঢ় হবে।
