নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অঙ্গনে বাংলাদেশের দাপুটে উপস্থিতি আরও একবার প্রমাণ করল বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। বিদেশি চার্টারারের সঙ্গে জটিল বাণিজ্যিক বিরোধে আইনগত লড়াইয়ের পথে না গিয়ে, শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত সফল মেডিয়েশন প্রক্রিয়ায় বিএসসি আদায় করেছে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার- যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
ঘটনার পটভূমি
২০১৯ সালের মে মাসে বিএসসি’র বহরে যুক্ত হয় আধুনিক কেমিকেল/প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এম.টি. বাংলার অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিয়োজিত এই জাহাজটি ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিল জাহাজটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভিত্তিক একটি চার্টারার প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাণিজ্যে নিযুক্ত হয়।
সেপ্টেম্বর ২০২২-এ, জাহাজটি ইন্দোনেশিয়ার তিনটি বন্দর থেকে ভেজিটেবল অয়েল পরিবহন করে ইতালির সিসিলির জেলা বন্দরে (Gela Port) পৌঁছায়। তবে কার্গো খালাসের সময় দেখা যায় যে, ৫টি কার্গো ট্যাংকের কোটিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা ভবিষ্যতে জাহাজ পরিচালনায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারত। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রটেকশন & ইনডেমনিটি ক্লাব (Protection & Indemnity club (P&I Club) এবং হাল এবং মেশিনারি ইনস্যুরার (Hull & Machinery Insurer)-কে জানানো হয়। তবে বিএসসি এবং চার্টারার উভয় পক্ষের বিভিন্ন ল্যাবরেটরী পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ মতামতে জাহাজের কার্গো ট্যাংক কোটিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারে কোন পক্ষকে এককভাবে দায়ী করার যথোপযোক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে কৌশলী সমাধান
এমতাবস্থায়, প্রটেকশন এন্ড ইনডেমনিটি ক্লাব ও হাল এবং মেশিনারি ইনস্যুরার চার্টারারের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনী প্রক্রিয়ায় যেতে নিরুৎসাহিত বোধ করে। এবং প্রথাগত আইনি পদক্ষেপে না গিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া (Alternative Dispute Resolution) অর্থাৎ মেডিয়েশন গ্রহণে আগ্রহী হয়। পরবর্তীতে, বিএসসির নিয়োগকৃত ইংরেজ মেরিটাইম আইনজ্ঞও বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং বিএসসি’র আর্থিক লাভ বিবেচনায় একজন নিরপেক্ষ মেডিয়েটর নিয়োগের মাধ্যমে বিএসসি, চার্টারার ও সাব-চার্টারার (ইতালি ভিত্তিক চার্টারার) সমন্বয়ে বিষয়টি মেডিয়েশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি’র জন্য পরামর্শ দেন। বিএসসি নিয়োগপ্রাপ্ত ইংরেজ মেরিটাইম আইনজ্ঞানুসারে এই পথটিই ছিল বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে কার্যকর।
লন্ডনে সফল মেডিয়েশন ও আলোচনার টেবিলে সাফল্য
বিষয়টির মীমাংসায় নিরপেক্ষ মিডিয়েটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা আইনজ্ঞ ও মিডিয়েটর স্টিফেন মিলস-কে। পরে ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ লন্ডনে অনুষ্ঠিত মেডিয়েশনে বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষি। প্রথমদিকে ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব ছিল মাত্র ১ মিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে দক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার মাধ্যমে বিএসসি এমডির দূরদর্শী নেতৃত্বে তা বাড়িয়ে ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায়ে সক্ষম হয় বিএসসি। অর্থাৎ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সক্ষম হয় বিএসসি।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, এই সাফল্য শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতিফলন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মহলে এই ঘটনা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। অনেকেই একে বিএসসি’র জন্য একটি মাইলফলক এবং শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন যা ভবিষ্যতের জাহাজ পরিচালনা ও চুক্তি আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনা বিএসসি’র পেশাদারিত্ব, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মানের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার স্পষ্ট প্রমাণ। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নৌখাতের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক পরিসরে শান্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার মাধ্যমে জটিল সমস্যা সমাধানের এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে জানান মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা।