আহমেদ পাবেল, সিলেটঃ রাজস্ব ফেরার কথা, বাস্তবতা ভিন্ন
সিলেট অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু ও সড়ক নির্মাণ করেছে। টোল আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফেরার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব টোল প্লাজা এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। রসিদ ছাড়া টোল আদায়, কোটি টাকার খাস কালেকশন গায়েব, টাকার হিসাব না মেলানো—এসব চিত্র এখন সিলেটের টোল ব্যবস্থাপনায় নিত্যদিনের ঘটনা।
ছয়টি টোল প্লাজা, রাজস্বের স্রোত—কোথায় যাচ্ছে টাকা?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের ছয়টি টোল প্লাজার মধ্যে তিনটি—শেরপুর সেতু, শাহপরাণ বাইপাস সেতু ও ফেঞ্চুগঞ্জ কুশিয়ারা নদীর সেতু—আগে পরিচালনা করত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘এটিটি’। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে এ তিনটির দায়িত্ব নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। বাকি তিনটি হলো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রুস্তমপুর, রাণীগঞ্জ ও ছাতক টোল প্লাজা।
প্রতিদিন শেরপুর থেকে আদায় হয় ৪–৫ লাখ টাকা, ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে দেড়–দুই লাখ এবং শাহপরাণ সেতু থেকে ১–১.৫ লাখ টাকা। অথচ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে এর নামমাত্র অংশ। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন বা এক দিন পরপর টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সপ্তাহখানেক পর বা তারও পরে জমা দেওয়া হয়।
রসিদ ছাড়া টোল আদায়, সফটওয়্যার থাকলেও ব্যবহার নেই
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছোট যানবাহন বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা থেকে রসিদ ছাড়াই টোল আদায় হচ্ছে। কোথাও কোথাও সফটওয়্যার থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা হয় না; চলছে হাতে লেখা রশিদে আদান–প্রদান। ফলে টোল আদায়ের তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক টাকার কোনো রেকর্ডই থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কারা পাচ্ছে এই অবৈধ আয়ের ভাগ?
ভুয়া সনদের জটিলতায় ঝুলে থাকা টেন্ডার
সবচেয়ে বড় অনিয়ম হলো দুই বছরেও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া। সওজ কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদের জটিলতা।
‘মেসার্স মো. জামিল ইকবাল’ নামের প্রতিষ্ঠান ছয়টি টোল প্লাজার সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও তারা যে অভিজ্ঞতা সনদ জমা দিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ২০২০–২০২৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে তারা কাজ করেছে—যেখানে ছিল স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়, ওজন পরিমাপ ব্যবস্থা ও সিসিটিভি স্থাপন।
কিন্তু সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়—বাস্তবে এমন কোনো আধুনিক অবকাঠামো নেই। কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা টেন্ডার জমা দেওয়ার সময়ের পর বসানো হয়েছে।
নূর আজিজুর রহমান আজকের সিলেটকে বলেন, আমাদের দেখানো প্রকল্পের কাজ বাস্তবে নেই বললেই চলে। শুধু কাগজে-কলমে CSR প্রকল্প দেখানো হয়েছে।
সিন্ডিকেটের ‘দুর্নীতির খেলা’
বিশ্লেষকদের দাবি, একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট বছরের পর বছর টোল ইজারা নিয়ে দুর্নীতির খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। দরপত্র ডাকা হলেও ইচ্ছেমতো প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মূল্যায়নে বিলম্ব করা হয়। অনেক সময় ৩০–৪০ শতাংশ কম দরদাতা এলেও তাকে কাজ না দিয়ে অপেক্ষা করা হয়—যাদের সঙ্গে আগে থেকেই ভাগবাটোয়ারা ঠিক থাকে।
শুধু এই ছয়টি প্লাজাই নয়, বিশ্বনাথ, জকিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ছাতকসহ আরও কিছু এলাকায় একই অনিয়ম চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, থমকে যাচ্ছে উন্নয়ন
টোল থেকে যে রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা, তা দিয়েই মূলত সড়ক সংস্কার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অর্থ লোপাট হওয়ায় উন্নয়নও থমকে আছে। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া এবং ভুয়া সনদদাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সওজ সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদা আজকের সিলেটকে বলেন, আগামী সোমবার টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভা হবে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।