ChatGPT said:
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার ১নং ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মানুষ প্রতি বছর বর্ষাকালে চার মাস ধরে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ, লাখাই বাজার থেকে বামৈ পর্যন্ত মাত্র ছয় দশমিক বিশ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নিচু রাস্তা। এই সড়ক বর্ষায় ডুবে গিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে নৌকা ছাড়া বিকল্প পথ থাকে না।
এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভাটি অঞ্চলের মানুষ। এই এলাকার লাখাই বাজারে বেচাকেনা করতে আসে পাশ্ববর্তী উপজেলা থেকেও অনেক মানুষ। কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া ওই বাজারে, স্কুল-কলেজে কিংবা জেলা ও উপজেলা সদর যেতে না পারায় ইউনিয়নের বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত লাখাই উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে হাওড়বেষ্টিত ১নং লাখাই ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম। বর্ষায় প্রায় চার মাস এসব গ্রাম একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। প্রতিটি গ্রামে যেতে নৌকা প্রয়োজন হলেও সন্ধ্যা ৬/৭টার পর নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর কেউ অসুস্থ হলে বা হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও সহজে নৌকা পাওয়া যায় না। অনেক সময় পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অথচ মাত্র ছয় দশমিক বিশ কিলোমিটার রাস্তা উঁচু করলেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলত। এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি জানিয়ে এলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
১৯৯৯ সালে সাংবাদিক প্রোটন দাশ গুপ্ত “দৈনিক লাল সবুজ” ও “সাপ্তাহিক সুগন্ধা” পত্রিকায় লিখেছিলেন, “রাস্তা নাই, ঘাট নাই, থানার নাম লাখাই।” তারপর থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই সড়ক উঁচু করার দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
লাখাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তফা কামাল খরছু জানান, “জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসলে বারবার দাবিটি জানানো হয়। নির্বাচনী না হলেও নেতারা অনেক প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।”
বর্ষা মৌসুমে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়ার মূল ভরসা নৌকা। লাখাই বাজার থেকে হবিগঞ্জ সদরের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। শুকনো মৌসুমে এই রাস্তায় সিএনজি, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলসহ নানা যানবাহন চললেও বর্ষাকালে সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় স্বজন গ্রামের রায়হান উদ্দিন বলেন, “লাখাই বাজার থেকে বামৈ পর্যন্ত রাস্তার অধিকাংশ অংশ বর্ষায় ডুবে যায়। বিশেষত শিকনপুর ব্রিজ থেকে লাখাই বাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার পুরোপুরি পানির নিচে থাকে। ফলে আমাদের যাতায়াতে মারাত্মক কষ্ট হয়।”
তিনি জানান, শুকনো সময় ১৫ থেকে ২০ টাকায় যেখানে যাওয়া যায়, বর্ষায় সেখানে ভাড়া ৫০ টাকা হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর হলে নৌকা রিজার্ভ করতে ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়।
ঢাকাস্থ লাখাই উপজেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. শাহাজান মিয়া বলেন, “মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে নিচু সড়কটি দ্রুত উঁচু করার দাবি জানাচ্ছি।”
বামৈয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়া কলেজের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “লাখাই বাজার দেড় শ বছরের পুরোনো। এই বাজারের সাথে মানুষকে যুক্ত রাখতে হলে সড়ক উন্নয়ন অপরিহার্য।”
লাখাই ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, “স্বৈরাচারী সরকারের আমলে লাখাইয়ে কোনো উন্নয়ন হয়নি। লাখাইবাসীর একটাই দাবি—লাখাই থেকে বামৈ পর্যন্ত রাস্তা উঁচু করা হোক।” তিনি জানান, বর্ষায় শিকনপুর ব্রিজ থেকে লাখাই বাজার পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০-৬০টি নৌকা চলে, প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ যাতায়াত করেন।
লাখাই ইউনিয়ন ছাত্র কল্যাণ পরিষদের সভাপতি গোলাম রব্বানী শাকির বলেন, “চার মাস আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমাদের দাবি, সাব-মার্সিবল রাস্তা উঁচু করে নির্মাণ করা হোক।”
হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, “লাখাই টু বামৈ রাস্তা উঁচু করার প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি বর্তমানে যাচাই-বাছাই কমিটিতে রয়েছে। লাখাইবাসীর জন্য সুখবর আসতে পারে।”
