এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া,সিলেটঃ সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের পানিতে সূর্যের আলো পড়লেই ঝলমল করে ওঠে নীলাভ আভা। স্থানীয়রা বলেন, এই পানিই একসময় দেশের সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছাতে পারে মরুপ্রধান মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে থাকা আফ্রিকার দেশগুলোতে।

বিশ্ব যখন তীব্র পানি সংকটে হাহাকার করছে, তখন বাংলাদেশের নদী-খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের বিশাল জলভাণ্ডার নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার গল্প লিখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই জলসম্পদই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন শক্তি—‘ব্লু গোল্ড’ বা নীল সোনা।

বিশ্বে পানির সংকট, বাংলাদেশে প্রাচুর্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য বলছে—২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ চরম পানিসঙ্কটে পড়বে। বর্তমানে প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে। এমন সময়ে বাংলাদেশের গড়ে ২৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, ৭০০টিরও বেশি নদী ও অসংখ্য হাওর-বাঁওড় দেশটিকে দাঁড় করিয়েছে এক ব্যতিক্রমী ভূপ্রাকৃতিক বাস্তবতায়।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট অঞ্চলের পানির পিএইচ ও টিডিএস মাত্রা স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক মানের বোতলজাত পানির উপযোগী। বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি এতটাই বিশুদ্ধ যে বিশেষজ্ঞরা একে বাংলাদেশের জন্য “সোনার খনি” বলছেন।

বৈশ্বিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা
বোতলজাত পানির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালে এই বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৫২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ যদি এ বাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তবে বছরে আনুমানিক ৩.৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে।
পানি রপ্তানির রূপরেখা: কী করতে হবে এখনই?
১. বর্ষার পানি সংরক্ষণ: পরিবেশবান্ধব জলাধার ও বাঁধ নির্মাণ, হাওর অঞ্চলে ড্রেনেজ ও ওভারফ্লো খাল তৈরি।
২. আধুনিক শোধনাগার: আন্তর্জাতিক মানের পরিশোধন প্রযুক্তি ও UV ফিল্টার ব্যবহার; সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পানি শিল্পাঞ্চল।
৩. রপ্তানিমুখী অবকাঠামো: বোতলজাত পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল, শুল্কছাড় ও শুল্কমুক্ত সুবিধা।
৪. গুণমান ও সার্টিফিকেশন: ডব্লিউটিও অনুমোদিত মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, ডিজিটাল ট্রেসিং ব্যবস্থা।
৫. ব্র্যান্ডিং: ‘Bangladesh Pure Water’—হালাল ও পরিবেশবান্ধব ব্র্যান্ড হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ।
বিশ্বের মডেল, বাংলাদেশের সুযোগ
সিঙ্গাপুরের নিউওয়াটার প্রযুক্তি, সৌদি আরবের হালাল পানি ব্র্যান্ড, ফ্রান্সের ইভিয়েন কিংবা ভারতের হিমালয়ান ব্র্যান্ড—সবই প্রমাণ করে কৌশলগত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি দিয়ে পানি অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা, প্রাচুর্য জলসম্পদ ও সাশ্রয়ী শ্রম ব্যয়কে কাজে লাগিয়ে এই মডেলগুলো আরও সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

‘নীল সোনা’র যাত্রা এখানেই শুরু
বাংলাদেশের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ। জলবায়ু সংকটের এ সময়ে বিশুদ্ধ পানির বৈশ্বিক চাহিদা কেবল বাড়বে। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের পানি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়—“বাংলাদেশের পানি এখন শুধু জীবন নয়, অর্থনীতিরও চালিকাশক্তি হতে চলেছে।