ফেনীর গুথুমায় ১৭ বছরের জমি দখল কাহিনি: খুনি সিরাজ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অন্ধকার

by The Justice Bangla

ফেনী প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশে জমি নিয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনের প্রয়োগে বৈষম্যের কারণে অনেক বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার উত্তর গুথুমা গ্রামের নিরীহ কৃষক সিরাজ মিয়ার জমি দখল কাহিনি এই বাস্তবতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

জমি দখলের দীর্ঘ ইতিহাস
প্রায় ১৭ বছর আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি নুরুল ইসলামের ছেলে সিরাজ—যাকে এলাকায় অনেকে “খুনি সিরাজ” নামে ডাকেন—তার প্রভাবশালী সহযোগীদের নিয়ে সিরাজ মিয়ার জমি দখল করে নেয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে ও দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই দখলদারি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বলেয়!
সিরাজ শুধু একজন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি নন; তার পরিবারও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।
তার এক ছেলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
আরেক ছেলে তিতুমির কলেজের সহ-সভাপতি।
পরিবারটি সাবেক এমপি আলাউদ্দিন নাসিমের ঘনিষ্ঠ মহলে থাকার সুবাদে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই ভয়-ভীতি ও দখল রাজনীতি কায়েম করেছে।

এই রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়েই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে দখল ধরে রাখে।

নিরীহ মানুষের অসহায়তা
সিরাজ মিয়া তার জমি ফিরে পাওয়ার জন্য থানা, কোর্ট ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে বহুবার ঘুরেছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। অবশেষে হতাশ হয়ে তিনি জমির আশা ছেড়ে দেন।

তবে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাহস সঞ্চয় করে আবার জমি দখলে গিয়ে বিক্রি করেন রফিকুল ইসলাম নামে এক ক্রেতার কাছে। কিন্তু এখানেই নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়ায় “খুনি সিরাজ”।

সন্ত্রাস ও মিথ্যা মামলার ফাঁদ
দখলদার পক্ষ আবারও সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে মাঠে নামে। সিরাজ মিয়ার জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় নানা বাধা সৃষ্টি করা হয়, এমনকি তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করার চেষ্টা চলে।

প্রশ্ন জাগে—একজন স্থানীয় নেতা ও তার পরিবার কীভাবে এত প্রভাব বিস্তার করে?
প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতাসীন দলে থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ভোগ করেছে তারা।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের নীরবতা ও বিচার ব্যবস্থার জটিলতা তাদের সুবিধা দিয়েছে।
তৃতীয়ত, এলাকার মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি, ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়েছে।

এই ঘটনা শুধু একজন সিরাজ মিয়ার নয়, বরং বাংলাদেশের অনেক গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই হয়ে ওঠে জমি দখল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ার। আইনের শাসন দুর্বল হলে এবং মানুষ ভয়ে চুপ থাকলে এমন দখলদাররা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

গুথুমার এই কাহিনি একটি প্রশ্নই সামনে আনে: রাজনীতি কি মানুষের কল্যাণে, নাকি কিছু লোকের দখলদারি স্বার্থ রক্ষায়?
যদি নিরীহ সিরাজ মিয়ার মতো মানুষরা ১৭ বছর ধরে তাদের জমির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের শাসনকেই সর্বোচ্চ করতে হবে।

You may also like

Leave a Comment