সায়মুন শেখঃ চট্টগ্রাম নগরীতে ফুটপাত ও সড়ক দখলের প্রবণতা এখন গভীর নগর সংকটে রূপ নিয়েছে। একসময় পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাতগুলো বর্তমানে অস্থায়ী দোকান, ভ্যান, স্টল ও পার্ক করা যানবাহনের দখলে। বহু এলাকায় ফুটপাতের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে, যা নগরবাসীর জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
নিউমার্কেট, চকবাজার, পাঁচলাইশ, বহদ্দারহাট, কাজির দেউরি, সিআরবি, আগ্রাবাদ, বড়পুল, নয়াবাজার, সাগরিকা, বিটাক, অলংকার, কর্নেলহাটসহ নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত দখলের চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিউমার্কেট মোড়, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, জিইসি মোড়, জামালখান ও ষোলশহর এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। এসব এলাকায় ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের বড় অংশ দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে, ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নিউমার্কেট এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা সড়কের প্রায় অর্ধেক অংশ দখল করে রেখেছেন। এতে পথচারীদের ব্যস্ত সড়কের মাঝ দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে দুই নম্বর গেইট ও আশপাশের এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে গত কয়েক মাসে দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী স্টলের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষকে এখন চলন্ত যানবাহনের ফাঁক গলে হাঁটতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুযায়ী, নগরীর প্রায় ৭১ শতাংশ ফুটপাত বর্তমানে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অবৈধ দখলে রয়েছে। একই জরিপে দেখা গেছে, নগরীর ৯৭ শতাংশ সড়ক কোনো না কোনোভাবে দখল হয়ে আছে এবং ৬৪ শতাংশ সড়কে নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা নেই। এসব তথ্য চট্টগ্রামকে কার্যত একটি পথচারীবান্ধব নগরী থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত ও সড়ক দখলের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বড় ভূমিকা রাখছে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যস্ফীতি, শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরুতে অনুমতি ও পুঁজির জটিলতা অনেক মানুষকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ঠেলে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) তথ্যমতে, নগরীতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা করেন। এর ফলে গড়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ফুটপাত কার্যত হকারদের দখলে থাকে।
ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে পড়াশোনার খরচ ও পারিবারিক ব্যয় মেটাতে তারা এই পেশা বেছে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগেই বেকারের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ, যা ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ফুটপাত দখলের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৩৬৮ জন বা ৫৬ শতাংশই পথচারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত দখল ও নিরাপদ পারাপারের অভাব এই উচ্চ মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ। এসব সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহরের তালিকায় ১২তম অবস্থানে রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, ফুটপাত দখল উচ্ছেদে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি উচ্ছেদ সম্ভব নয়, কারণ এতে বহু মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তিনি জানান, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনে অ্যাডিশনাল মার্কেট ও আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট নির্মাণ, নির্দিষ্ট সময় ও এলাকায় অস্থায়ী ব্যবসার স্থান নির্ধারণ এবং পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে ফুটপাত ও সড়ক দখলের সমস্যা এখন আর কেবল নগর ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সংকট। মানবিক পুনর্বাসন, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার সমন্বয় ছাড়া এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে চট্টগ্রামে দুর্ঘটনা ও যানজটের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
