কুশিয়ারার ভাঙনে মানচিত্র হারাচ্ছে জকিগঞ্জের জনপদ

সীমান্তবর্তী এলাকায় অব্যাহত নদীভাঙনে হুমকির মুখে জনজীবন ও ভূখণ্ড

by Samir Khan
কুশিয়ারার ভাঙনে মানচিত্র হারাচ্ছে জকিগঞ্জের জনপদ

সিলেট প্রতিনিধি: সিলেটের জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র। প্রতিবছর বর্ষায় ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এই নদী ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও জনপদ গ্রাস করে নিচ্ছে। ফলে নিঃস্ব হচ্ছেন শত শত পরিবার, হারিয়ে যাচ্ছে শেষ সম্বল।

উত্তর-পূর্ব সীমান্তের জকিগঞ্জ উপজেলা তিনদিক দিয়ে ঘেরা ভারতের সীমানায়। অপর পাশে কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজার উপজেলা। এ অঞ্চলেই বরাক নদী থেকে জন্ম নেয় সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর ২২ কিলোমিটার অংশ সীমান্ত নদী হিসেবে পরিচিত, যা বারঠাকুরী ইউনিয়নের আমলসীদ থেকে বিরশ্রী ইউনিয়নের লক্ষীবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই নদীর ভাঙন এখন সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য মূর্ত আতঙ্ক। আমলসীদ থেকে লক্ষীবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও জনবসতি একে একে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের তীব্রতায় বদলে যাচ্ছে এলাকার ভৌগোলিক চিত্রও।

সরকার কিছু এলাকায় ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিলেও কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের লালগ্রাম, ফেউয়া, সেনাপতিরচক, রারাই, মুমিনপুর, মানিকপুর, বাখরশাল, ষরিসা, শষ্যকুড়ী ও ছবড়িয়া গ্রামগুলোতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময়মতো কাজ না হওয়ায় প্রতিদিনই নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে জমি ও ঘরবাড়ি।

রারাই গ্রামের বাসিন্দা ও সাংবাদিক জুবায়ের আহমদ জানান, “একসময় আমাদের গ্রামটা অনেক বড় ছিল। নদীর ডাইক অনেক দূরে ছিল। ছেলেরা মাঠে খেলে সাঁতরে ওপারে চলে যেত। এখন নদী এতটাই কাছে চলে এসেছে যে আমাদের বাড়ি নদীর একদম পাড়ে। অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে অন্যের দয়ার ওপর বাস করছেন।”

সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভাঙন ও বন্যা রোধে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দুই নদীর ১০৫ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং ৮ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতের কাজ করা হবে। যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অংশে নদীর পাড় ঘেঁষেই জনবসতি এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতে পুকুর থাকায় পুকুরের মাধ্যমে নদীর সাথে সংযোগ তৈরি হয়। ফলে মাটি ও বালু নিচে নামতে থাকে, আর তাতেই সৃষ্টি হয় ভাঙন। অন্যদিকে, ভারতের অংশে জনবসতি নদী থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকায় সেখানে চর জেগে উঠছে।

স্থানীয়দের মতে, পাউবোর প্রকল্পটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে কিছুটা স্বস্তি আসবে। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘসূত্রতা বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে।

এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ। না হলে ভবিষ্যতে শুধু স্থানীয় জীবনযাত্রা নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ড রক্ষাও হুমকির মুখে পড়বে। স্থানীয়রা মনে করছেন, ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে—চোখের সামনে দেশের মানচিত্র বদলে গেলেও আমরা নীরব থেকেছি।

You may also like

Leave a Comment