স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও কাদামাখা সেই পথ

পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা, এক বাড়ি, একটাই স্বপ্ন এক টুকরো পাকা রাস্তা

by The Justice Bangla

আব্দুর রহিম, বিশেষ প্রতিনিধিঃ এই মাটিতেই একদিন গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার ডাক। ফেনীর সীমান্তঘেঁষা জনপদে অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে যাঁরা লড়েছিলেন, তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল পথঘাট, মাঠ-ঘাট।

মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা আর মেজর রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে সংগঠিত প্রতিরোধ ফেনী হয়ে উঠেছিল সেক্টর–১-এর এক অবিচ্ছেদ্য শক্ত ঘাঁটি।

সেই ফেনীতেই আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। যুদ্ধ জয়ের গল্পের নায়ক পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবার আজও হাঁটেন কাদামাখা এক সরু পথে।

ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের মধ্যম লেমুয়া মাস্টারপাড়া আব্দুল আজিজ হাজী বাড়ি। একই উঠোনে পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আজ সেখানে বসবাস করছে চল্লিশের বেশি পরিবার।

এই বাড়ির পাঁচ সন্তানের তিনজন এখনও বেঁচে আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামান, মো. আবুল কাশেম ও ওবায়দুল হক। আর দুইজন করিমুল হক ও আরিফুল হক চলে গেছেন না-পাওয়ার দীর্ঘ আক্ষেপ বুকে নিয়েই। জীবদ্দশায় তাঁরা কেউই দেখে যেতে পারেননি নিজেদের বাড়ির সামনে একটি পাকা রাস্তা।

লেমুয়া বাজার বণিক সড়ক থেকে শহীদ জয়নাল আবেদিনের নামে নামকরণ করা প্রায় ৩০০ ফুটের এই পথই তাদের জীবনের একমাত্র ভরসা। স্বাধীনতার পর নিজেরাই মাটি ভরাট করে, ইট বিছিয়ে কোনোরকমে চলাচলের ব্যবস্থা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিলেন, রাষ্ট্র একদিন তাঁদের কথা মনে রাখবে। কিন্তু বছর ঘুরেছে, সরকার বদলেছে, জনপ্রতিনিধিরা এসেছেন–গেছেন শুধু বদলায়নি এই পথের ভাগ্য।

বর্ষা নামলেই পথ হারিয়ে যায় কাদা আর পানির নিচে। স্কুলগামী শিশুদের পা পিছলে পড়ে যায়, বৃদ্ধদের হাঁটতে হয় লাঠির ভরসায়। অসুস্থ হলে কাঁধে তুলে নিতে হয় মানুষ কারণ অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার কোনো উপায় নেই। বিকল্প রাস্তা নেই বলেই কাদা মাড়িয়েই চলতে হয় স্বাধীন দেশের নাগরিকদের।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কাশেম কাঁপা কণ্ঠে বলেন, দেশের আনাচে-কানাচে এখন পাকা রাস্তা। জানি না, মারা যাওয়ার আগে নিজের বাড়ির সামনে একটা পাকা রাস্তা দেখে যেতে পারব কি না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামানের চোখে জমে ওঠে দীর্ঘ বেদনা
আমরা লড়েছিলাম যেন মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে। অথচ বর্ষার সময় ঘর থেকেই বের হতে পারি না। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া যায় না, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না।

এই কষ্ট শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, এই কষ্ট প্রজন্মের পর প্রজন্মের। গ্রামের শিক্ষার্থীরা জানায়, কাদার জন্য অনেক দিন স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না। বইখাতা বাঁচাতে গিয়ে থেমে যায় স্বপ্নের পথচলা।

ফেনী জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক মুনিরা হক জানিয়েছেন, শহীদ জয়নাল আবেদিন সড়ক পাকাকরণের বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লিখিত আবেদন পাওয়া গেছে। তিনি আশ্বাস দেন, দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু এই পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা আজও অপেক্ষায়। তাঁদের চাওয়া খুব বড় নয় কোনো পদক নয়, কোনো সম্মাননা নয়। শুধু একটি পাকা রাস্তা।

যে রাস্তায় হেঁটে তাঁরা অন্তত শেষ বয়সে বলতে পারবেন এই দেশ আমাদের ভুলে যায়নি।

You may also like

Leave a Comment