প্রীতম সরকার: সম্প্রতি নেট দুনিয়া জুড়ে আলোচনার ঝড় স্টারলিঙ্কের ইন্টারনেট পরিষেবাকে ঘিরে। স্টারলিঙ্ক কি ইন্টারনেট সর্বরাহ করবে নাকি আলাদিনের চেরাগের মতো জাদু ছড়াবে বুঝে উঠাই মুশকিল। পুরো বিশ্বে স্টারলিঙ্কের পরিচিতি আরো আগে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় যেনো তা একদম নতুন।
আর এই নতুনত্বের কারণেই স্টারলিংয়ের ইন্টারনেট নিয়ে বাংলাদেশের নেট দুনিয়ায় এতো বেশি সরব!
স্টারলিংকের আগমনকে কেন্দ্র করে অন্যান্য ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে নিয়ে নেটিজেনরা মেতেছেন মিমস-ট্রোল আর হাসি তামাশায়।
প্রশ্ন এখন একটাই অন্যান্য ইন্টারনেট পরিসেবা থেকে কেনো স্টারলিং ভিন্ন? কেনো স্টারলিং এতো বেশি স্পেশাল ও আকর্ষণীয়?
বলে রাখা ভালো, দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটানের পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোনো দেশ যেখানে স্টারলিংয়ের সেবা পেতে যাচ্ছে গ্ৰাহকরা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানেও স্টারলিং পরিষেবা খুব দ্রুত চালু হচ্ছে যাচ্ছে। তবে ভারতে এই সেবা পেতে আরো ১২ মাস অপেক্ষা করতে হবে।
স্টারলিং (Starlink) মূলত স্পেসএক্স নামক একটি বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার প্রকল্প, যা প্রতিষ্ঠা করেছেন ইলন মাস্ক (Elon Musk)। বর্তমানে (২০২৫ পর্যন্ত) ৫’হাজারের বেশি স্টারলিং স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। স্টারলিং মূলত স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ইন্টারনেট সেবা দেয়।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে, স্টারলিংয়ের আলোচনায় আসার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। কারণ- এটি একটি Satellite Internet Service, যেটি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের মতো জায়গায় যেখানে অনেক দুর্গম অঞ্চল এখনো ব্রডব্যান্ড থেকে বঞ্চিত, সেখানেই এটি বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্বব্যাপী আলোচনায় যখন স্টারলিং
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এটি ড্রোন ও মিলিটারি যোগাযোগে ব্যবহার করা হয়। ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় দুর্গত এলাকায় জরুরি ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পারার কারণে স্টারলিং তাৎক্ষণিক আলোচনায় আসে।
বেশিরভাগ মানুষ এখনো অপটিক্যাল ফাইবার বা মোবাইল নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু Starlink দাবি করে তারা তাদের সেবার মাধ্যমে ১০০ এমবিপিএস গতি দিতে পারে, আবার কোনো তার ছাড়াই রিমোট এলাকায় কাজ করতে সক্ষম এই স্টারলিং।
Latency কম হওয়ায় গেমিং বা ভিডিও কলে ভালো পারফর্ম করে থাকে যার দরুণ অনেকেই এখন আগ্রহী হচ্ছেন=বিশেষ করে যারা গ্রামে থাকেন, ট্রাভেলার বা অনলাইন ওয়ার্কার।
মূলত স্টারলিংয়ের সেবার বিশেষ সুফল পাবেন দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের বাসিন্দারা, যেখানে প্রচলিত ব্রডব্যান্ড পৌঁছায় না। ফ্রিল্যান্সার, ব্যবসায়ী ও এনজিওদের জন্য এটি বেশ চমকপ্রদ যারা নিরবিচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট চান। এছাড়া যেসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক কারণে ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত হয় তাদের জন্য এই ইন্টারনেট পরিষেবা যেনো মেঘ না চাইতেও বৃষ্টির মতো।
এছাড়া বর্তমানে স্টারলিং নিয়ে অনেক বাংলা টেক ইউটিউবার ও সংবাদমাধ্যম ভিডিও, নিউজ প্রকাশ করছেন, যেগুলো ভাইরাল হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের আগ্রহের মাত্রা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করছে।
স্টারলিং-এর বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে চলতি বছরের ২০ মে। এটি স্পেসএক্স কোম্পানির স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেটের পরিষেবা, যা এখন বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় মানুষ উপভোগ করতে পারবে।
স্টারলিং এর বর্তমান মাসিক সাবস্ক্রিপশন ৪ হাজার ২শ’ টাকা এবং এককালীন সরন্জামে খরচ পড়বে ৪৭ হাজার টাকা। স্টারলিংকের একটা ‘ডিভাইস’ (যন্ত্র) থেকে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মিটার পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যাবে, যা বেশ অভাবনীয়। গ্রামে এটা ৫০ থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত হবে। এক ব্যক্তি কিনে বা একাধিক ব্যক্তি সমিতি আকারে কিনে সেটা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, স্টারলিং-এর স্যাটেলাইট ইন্টারনেট রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প।
ধারণা করা হয়, এই স্টারলিংয়ের উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা যা বাংলাদেশের নেট দুনিয়ায় যুগান্তকারী এক অভ্যুত্থান ঘটাবে। যদিও আমাদের দেশের ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী আইএসপিগুলো দামের বিচারে এখন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। কিন্তু ইন্টারনেটের গতি, পরিসেবার মান অনেকটাই তাদের প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। যার কারণে স্টারলিংয়ের প্রতি মানুষের বিশেষ আগ্ৰহ বেড়েছে।
