সৌরভ মজুমদার: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রথম ও প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনা জুড়ে অবস্থিত। ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা বন্দরটি বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আমদানি-রপ্তানির মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি করা হয়।
অতীতে চট্টগ্রাম শহর সংলগ্ন বন্দর এলাকাটি বিভিন্ন দেশের নাবিক ও বণিকরা তাদের ব্যবসার জন্য ব্যবহার করতো। ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বার্ষিক এক টাকা সেলামির বিনিময়ে নিজ খরচে কর্ণফুলী নদীতে কাঠ দিয়ে জেটি নির্মাণ করেন।
পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে প্রথম দুটি অস্থায়ী জেটি নির্মিত হয়। ১৮৭৭ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার গঠিত হয় এবং ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল সেটি কার্যকর হয়। এরই মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর নতুন দিগন্তের পথে যাত্রা শুরু করে। একই বছর চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি মুরিং জেটি নির্মিত হয়।
১৮৯৯ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে সম্মিলিতভাবে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে। তারই প্রেক্ষিতে ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে রেলওয়ের সংযোগ ঘটে। যা চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। সক্ষমতা বৃদ্ধির পর ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ব্রিটিশদের বিদায়ের পর পাকিস্তানিদেরও বিশেষ নজর ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের উপর। ১৯৬০ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনারকে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট-এ পরিণত করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পশ্চিম পাকিস্থানিরা বন্দরটিকে তাদের যুদ্ধের সরঞ্জাম ও রসদ আনা নেওয়া কাজে ব্যবহার করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার তার মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বন্দরের ব্যাপক সংস্কার করে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ( রাশিয়া ) যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া জাহাজগুলো উদ্ধার করে বন্দরের চ্যানেল সক্রিয় করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ বছর পর ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টকে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটিতে পরিণত করা হয়। এটি বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বন্দর হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দিন দিন এর কার্যক্রম ও পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের মধ্যদিয়ে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে বন্দরের সক্ষমতা। বর্তমানে চট্টগ্রামের সব টার্মিনাল (লালদিয়া, বে টার্মিনাল, পতেঙ্গা টার্মিনাল, মাতারবাড়ী) মিলিয়ে মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার টিইইউ। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ছয় গুণ বাড়িয়ে ৭৮ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রাত্রিকালে সাগরে চলন্ত জাহাজকে সংকেত প্রদর্শণের জন্য বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকায় ৫ টি বাতিঘর আছে। সড়কপথে বন্দরমুখী গাড়ি যাতায়াতের জন্য তৈরী করা হয়েছে পোর্ট লিংক রোড।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত রয়েছে প্রায় সাত হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী। আর এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা, কর্মচারীদের পরিবারের আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসার যোগান দিয়ে থাকেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রয়েছে বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী।
চট্রগ্রাম বন্দর বর্তমানে বিশ্বের প্রথম সারির একশ’টি বন্দরের তলিকায় রয়েছে। এই সংক্রান্ত একটি তালিকা প্রকাশ করেছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো পোর্ট ও শিপিং জার্নাল লয়েডস। যা এই বন্দরের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
২০২৪ সালে চট্রগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ হাজার ৫৫ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা। আগের বছর ২০২৩ সালে রাজস্ব আয় হয় ৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৮৯০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড হিসেবে তুলনা করেছেন। বন্দরে সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে এগিয়ে যাবে দেশের অর্থনীতি। তাই বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন্দর পরিচালনার জন্য বিদেশী কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শুধু বাংলাদেশ নয় চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নজর রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোরও। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত তার সেভেন সিস্টার্স নামক রাজ্য (অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা) পণ্য সরবরাহে বেক পোহাতে হয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পন্য খালাস করে খুব সহজে কুমিল্লা, ফেনী-রামগড় সীমান্ত দিয়ে পন্য সরবরাহ করতে পারে। এই লোভনীয় সুযোগটি গ্রহণের লক্ষ্যে ভারত সরকার খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ে একটি স্থলবন্দর নির্মাণ করে। তাছাড়া বাণিজ্য সুবিধা থাকায় চীনও চট্টগ্রাম বন্দরের উপর বিশেষ নজর রাখছে।
