রাজনীতির মাঠে অদম্য সংগ্রামী একরামুল হক ছুট্টু

শিবিরের হামলা থেকে কারাজীবন ফিরে দাঁড়ানো এক সাহসী ছাত্রনেতার গল্প

by The Justice Bangla

মোহাম্মদ সামিরঃ চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী চন্দনপুরা এলাকার সন্তান মোহাম্মদ একরামুল হক ছুট্টু নামটি আজ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এক দৃঢ় প্রতীকের মতো উচ্চারিত হয়। ছাত্রজীবন থেকেই যে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন আদর্শের টানে, সেই পথ আজও তিনি ধরে রেখেছেন অবিচলভাবে। হামলা, মামলা, কারাজীবন সবকিছুই পার করেছেন অদম্য সাহস নিয়ে।

শৈশব থেকে সংগ্রামের শুরু ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ একরামুল হক ছুট্টু। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, দৃঢ়চেতা ও সমাজ সচেতন। ১৯৮১ সালে ভর্তি হন বাকুলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৯২ সালে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে। ১৯৯৪ সালে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ২০০২ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তার মধ্যে রাজনীতি ও সমাজসেবার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তখনো তিনি বুঝে উঠতে পারেননি এই পথ তাকে একদিন আন্দোলন, জেল, নির্যাতন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক রাজনৈতিক জীবনে পৌঁছে দেবে।

ছাত্র রাজনীতিতে দৃপ্ত পদচারণা ১৯৯০-৯১ সালের গণআন্দোলনের সময় একরামুল হক ছুট্টু প্রথমবারের মতো ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তখন থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আল নোমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতির মাঠে নামেন।

১৯৯৪-৯৫ সালে তিনি নাজিমুর রহমান ও মোহাম্মদ আলী নেতৃত্বাধীন মহানগর ছাত্রদলের কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখনই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবনের কঠিন পরীক্ষা।

শিবিরের হামলা ও মৃত্যুর মুখোমুখি ১৯৯৩ সালে মহসিন কলেজে শিবিরের সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। তিন দিন ছিলেন কোমায়, পরবর্তী ৩৫ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে তিনি রাজনীতিতে আরও দৃঢ় হন।

তার কথায় ওই হামলার পর আমি শিবিরবিরোধী আন্দোলনে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হই। তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তখনকার ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদল ছিল একমাত্র প্রতিরোধ শক্তি।

এরপর থেকেই শিবির ও জামায়াতের দিক থেকে শুরু হয় মামলা-হামলার ধারা। ১৯৯৪ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক রাজনৈতিক মামলা হয়।

কারাজীবন ও পুনর্জাগরণ শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ৭ জুন ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। একটানা ২১ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান তিনি। কিন্তু এখানেই শেষ নয় ওয়ান ইলেভেনের সময় আবারও গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ ২৩ মাসের কারাজীবন অতিবাহিত করেন।

জেলখানার অন্ধকার দিনগুলোতে পরিবারও বিদেশে চলে যায়। কিন্তু তিনি মনোবল হারাননি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছেন।

রাজনীতিতে পদ-পদবীর চেয়ে আদর্শ আমার কাছে বড়। আন্দোলনের মাঠই আমার প্রাপ্তির জায়গা,বললেন একরামুল হক ছুট্টু।

ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে তিনি মোশারফ, দীপ্তি ও শাহেদের নেতৃত্বাধীন যুবদল কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দমন-পীড়নেও থামেননি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবারও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হন তিনি। টানা ১১ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান। কিন্তু রাজনৈতিক নির্যাতন, পুলিশি হয়রানি বা মিথ্যা মামলা কোনো কিছুই তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারেনি।

রাজপথে মিছিল, সভা-সমাবেশ কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচি সবখানেই একরামুল হক ছুট্টু আজও সক্রিয়।

তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এই নেতার লক্ষ্য নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এবং আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।

তার মতে, আজকের শিক্ষিত তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের চিন্তা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিকে আধুনিকায়ন করাই এখন সময়ের দাবি।


তিনি আরও বলেন,আমাদের সময়ে যেমন প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি ছিল, আমি চাই ভবিষ্যতে রাজনীতি থেকে প্রতিহিংসা দূর হোক। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই রাজনীতি এগিয়ে যাক।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একরামুল হক ছুট্টু এক সাহসী নাম যিনি প্রতিকূলতার ভেতর থেকেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন অদম্য সংগ্রামী হিসেবে। কারাগার, হামলা বা নির্যাতন তাকে দমাতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে গণতন্ত্রের পথে লড়াইয়ে।

রাজনীতির মাঠে তার উপস্থিতি আজও এক অনুপ্রেরণা বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করেন আদর্শই প্রকৃত রাজনীতির মূল শক্তি।

You may also like

Leave a Comment