নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দলিল,বৈধ আরএস, বিএস খতিয়ানকে পাশ কাটিয়ে একজনের ভ‚মি আরেকজনের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও, সরকারকে খাজনা না দেওয়া এবং বিএস খতিয়ান না থাকা স্বত্বেও রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে চট্টগ্রাম সদর সাব রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য। এ নিয়ে গত ২৩ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে থাকা বাংলাদেশ ফিন্যান্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, চান্দগাঁও সহকারী কমিশনার (ভূমি), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেন শরফুল হক নামে এক ভুক্তভোগী। সেখানে তিনি সাব রেজিস্ট্রারের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ নেতার ভবন দখল ও উচ্ছেদের বিষয় তুলে ধরেন।
অভিযোগপত্রে সাব রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য ছাড়াও অন্যান্য অভিযুক্তরা হলেন- ওমর ফারুক, বিগত সরকারের আওয়ামী লীগ নেতা আরশাদুল আলম বাচ্চু, শামিম আরা বেগম, রিপন চৌধুরী, রোওশন আরা বেগম, কেবি আব্দুল জলিল বাহাদুর, এডভোকেট আলি নওশাদ এবং সাবেক সাব রেজিস্ট্রার মনিরুজ্জামান।
দুর্নীতি দমন কমিশন, জেলা প্রশাসন ও এসি ল্যান্ড অফিস বরাবরে দেওয়া অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ওমর ফারুক জায়গাটি হেবামূলে ভোগ দখল করলেও তিনি এ পর্যন্ত কোন সরকারি খাজনা পরিশোধ করতে পারেননি। কারণ জায়গাটি তার বা তার বাবার নামে নয়। শাহনেওয়াজ খান ও তার উত্তরসূরীদের নামে জায়গাটির খতিয়ান এবং তারাই মূল মালিক। কিন্তু সুস্পষ্ট রেকর্ড থাকা সত্বেও ওমর ফারুক সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা দিয়ে জাল কাগজ তৈরি করে নিজেকে জায়গাটির মালিক বানান। এসব জাল কাগজমূলে তিনি জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে জায়গাটিতে অবৈধ সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে অবৈধভাবে উচ্ছেদ হওয়া ভুক্তভোগী শরফুল হককে সামাজিকভাবে হেয়ো করছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ওমর ফারুক আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে তফসিলি সম্পত্তি না থাকা স্বত্বেও আওয়ামী লীগ নেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুকে দান করেন। যাতে শামিম আরা বেগম, রিপন চৌধুরী, রোওশন আরা বেগম, কেবি আব্দুল জলিল বাহাদুর এবং এডভোকেট আলি নওশাদ সহযোগিতা করেছেন। এছাড়াও বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য এবং সাবেক সাব রেজিস্ট্রার মনিরুজ্জামান খাজনা খারিজ, মূল বিএস খতিয়ান, দলিল পর্যালোচনা না করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি দিয়ে দেন।
আরও জানা যায়, শরফুল হক প্রায় দুই যুগ ধরে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করলেও পতিত আওয়ামী সরকারের পতনের কয়েকমাস আগে কতিপয় যুবলীগ নেতা আরশাদুল আলম বাচ্চু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করে। সন্ত্রাসী ও অবৈধ দখলদারীর কারনে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমান সময়ে এসেও নানা হুমকির ফলে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং তার জীবন এখনো বিপন্ন।
তিনি বলেন, দখলকৃত ভবনে গত ২০ বছর ধরে এমএফসি নামক একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করে আসছিলাম। হঠাৎ করে বাচ্চু ও আব্দুল জলিল বাহাদুরের লোকজন এসে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে চলে যেতে হুমকি দেয়। পরবর্তীতে বাচ্চুর লোকজন ভবনের সামনে লোকজন জড়ো করে কলাপসিবল গেট স্থাপন করেন। সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ করে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের ভবনে প্রবেশে বাধা দেন। এরপর থেকে আমরা ব্যবসা হারিয়ে ফেলি। এখন ৫ই আগস্টের পর বাচ্চু পালিয়ে গেলেও সে তার অনুসারীদের দিয়ে ভবনটি দখল করে রেখেছে। তাই আমি প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দাখিল করেছি।
শরফুল হক আরও বলেন, আমি ২০০৫ সাল থেকে এখনও নিয়মিত ভাড়াটিয়া হিসেবে ভাড়া প্রদান করছি। ওমর ফারুকের সাথে আমার একটা রেজিস্ট্রার্ড চুক্তি আছে। পাশাপাশি ২০২১ সালে ৩তিন বছর মেয়াদি প্রোপার্টি বিক্রির আরেকটা রেজিস্টার্ড চুক্তি আছে। আমি যেহেতু নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছি তাই গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া গায়ের জোর খাটিয়ে উচ্ছেদ কীভাবে করে ? আর উচ্ছেদ করতে হলে আইনিভাবে নেয়া যেতো, আওয়ামী লীগ নেতাকে ব্যবহার করে আমাকে প্রকাশ্যে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে পারে না। যেহেতু উক্ত প্রোপার্টির বিএস নাই সেহেতু এই প্রোপার্টি এখন বায়নার কোন কার্যকারিতা নাই। বর্তমানে এই প্রোপার্টিতে ভাড়াটিয়ার পক্ষে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। এ অবস্থায় যেকোন ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ আদালতের অবমাননার শামিল। অবিলম্বে সাব রেজিস্ট্রারের দেয়া রেজিস্ট্রি বাতিল করতে হবে এবং ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, আমরা অভিযোগটি পেয়েছি। আপাতত দৃষ্টিতে বুঝার উপায় নেই, নেপথ্যে কী রয়েছে। বিষয়টি যাচাই করে দেখবো।
অপরদিকে অভিযুক্ত সদর সাব রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য বলেন, দানপত্র করা বা বিক্রি করা একমাত্র তাদের নিজেদের বিষয়। আমাদের কাছে যে সকল কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেখে রেজিস্ট্রি দেয়া হয়েছে। তারা খতিয়ানের কপি বা অন্যান্য কাগজপত্র যা দিয়েছেন, তা সঠিক কি না ভুল ক্রস চেক করার সুযোগ নেই। আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে, তাই দিয়েছি।
